করণদিঘীর এই ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, বরং রাজ্যে তৃণমূলের শাসনকালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। মঙ্গলবার রাতে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক গৌতম পালের দলীয় কার্যালয় ও সংলগ্ন গোডাউন থেকে সরকারি সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা কার্যত প্রমাণ করে, ক্ষমতায় থাকাকালীন কীভাবে সরকারি সম্পদকে দলীয় সম্পত্তি বলে ব্যবহার করা হয়েছে—এই অভিযোগ বহুদিনের, আর এবার তা যেন হাতেনাতে ধরা পড়ল।
সরকারি পলিথিন, লুঙ্গি, ধুতি, শাড়ি—যেগুলি সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ, বিশেষ করে গরিব ও দুস্থদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে—সেগুলি যদি বছরের পর বছর একটি দলীয় কার্যালয়ের পিছনে মজুত থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে: এই সামগ্রী কি প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে পৌঁছেছিল? নাকি এগুলি রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য জমিয়ে রাখা হয়েছিল?
স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, একটি ক্লাব দখল করে সেখানে দলীয় কার্যালয় তৈরি এবং তার পিছনে গোডাউন বানিয়ে সরকারি জিনিসপত্র মজুত রাখা—এটি কোনও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়। এটি স্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানোর উদাহরণ। আরও উদ্বেগের বিষয়, এতদিন ধরে এই কার্যকলাপ চললেও প্রশাসনের নজরে কেন আসেনি? তাহলে কি প্রশাসনের একাংশও নীরব সমর্থক ছিল?
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পরই এই ঘটনা সামনে আসা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় মানুষ ক্লাবটি দখলমুক্ত করতে গিয়েই যখন এই বিপুল সামগ্রীর হদিস পান, তখন বোঝাই যায়, রাজনৈতিক প্রভাব থাকাকালীন কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। অর্থাৎ, ভয় ও প্রভাবের রাজনীতি এতটাই গভীরে প্রোথিত ছিল যে সাধারণ মানুষ চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই ঘটনার পর প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের প্রশ্ন—এই তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে? অতীতে এমন বহু ঘটনায় দেখা গিয়েছে, প্রাথমিক উত্তেজনা কাটলেই তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়। ফলে এবারও যদি একই চিত্র দেখা যায়, তাহলে মানুষের আস্থা আরও কমবে।
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখন দেখার, এই ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে আদৌ কোনও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না, নাকি এটিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর পাঁচটা ঘটনার মতোই বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। সিপিআই(এম) উত্তর দিনাজপুর জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য আশীষ ঘোষ বলেন, ‘‘ওই ক্লাবটি করণদিঘির খেলাধুলো, সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল। আমরা এই ক্লাবে নানান রকম সামাজিক কাজকর্ম করতাম। গৌতম পাল বিধায়ক হওয়ার পর আমাদের ক্লাব থেকে বেদখল করেন। সেখানে গড়ে তোলেন তার সাম্রাজ্য। তার পরাজয়ের পরে আমরা করণদিঘির বাসিন্দারা ক্লাব ঘর খুলে দেখতে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়। সেখানে হাজারে হাজার লুঙ্গি শাড়ি জামা কাপড় ত্রিপল পড়ে রয়েছে যা সরকারি ত্রাণের সামগ্রী। এরপর আমরা করণদিঘী থানা এবং বিডিওকে খবর দিলে তারা ওই সামগ্রী উদ্ধার করে একটি বড় লরি করে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে আমরা করনদিঘি থানায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি।
Relief Materials Recovered
ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার তৃণমূল বিধায়কের অফিস সংলগ্ন ক্লাবে
×
Comments :0