অমিত কুমার দেব
নেই পর্যটকদের আনাগোনা, নেই চিল্ড্রেন পার্কে শিশুদের কলকাকলি। আর বামফ্রন্ট সরকারের আমলে গড়ে ওঠা খোল্টা ইকো-পার্ককে ঘিরে স্থানীয় মানুষেরা যে সমস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তারাও তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। এক চরম সংকটের মুখোমুখি এই মানুষেরা। ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি তারা। কোচবিহার ২নং ব্লকের মরিচবাড়ি-খোল্টা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত খোল্টা ইকো-পার্কের হৃতগৌরব ফিরিয়ে আনতে তাই কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিআই(এম) প্রার্থী প্রণয় কার্য্যীর জয় চাইছেন সংশ্লিষ্ট এই এলাকার সাধারণ মানুষ। শুক্রবার এই গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার খোঁচাবাড়ি হাটে সিপিআই(এম) প্রার্থীর প্রচার ঘিরে তাই বাড়তি উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেল এই এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে।
রাজ্যের বর্তমান সরকারের সীমাহীন অবহেলায় ধুঁকছে কোচবিহার ২নং ব্লকের মরিচবাড়ি-খোল্টা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার খোল্টা ইকো-পার্ক। ভেঙে পড়েছে এই পার্কের পরিকাঠামো। সবকিছু জেনেও উদাসীন সরকারের বন বিভাগ।
২০০৬ সালে রাজ্যের বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীসভায় অনন্ত রায় বনমন্ত্রী থাকাকালীন তার জন্মভূমি খোল্টা এলাকায় এই পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। প্রায় ৬৭বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠে এই পার্ক। যে জায়গায় এই পার্ক গড়ে ওঠে, তা আসলে একটি হেরিটেজ ফরেস্ট। কোচবিহারের রাজা আমলে এই এলাকায় লাগানো হয়েছিল বার্মা সেগুন গাছের চারা। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই চারা গাছগুলি কার্যত মহীরুহে পরিণত হয়। বন্দুকের বাট তৈরীর কাজে ব্যবহৃত হতো এই বার্মা সেগুন কাঠ। ইকোপার্ক তৈরির জন্য তৎকালীন সময়ে বেছে নেওয়া হয় এই সেগুন গাছের জঙ্গলকেই। এলাকার পরিবেশকে সুন্দর করে তোলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য করে তাদের সংসার প্রতিপালন করতে পারেন স্বচ্ছল ভাবে, এদিকে লক্ষ্য রেখেই গড়ে তোলা হয় চিলড্রেন পার্ক এবং ডিয়ার পার্ক। টয় ট্রেন, প্যাডেল বোট, ঝুলন্ত সেতু সবটাই ছিল এই পার্কে। এই পার্কে শোভা পেতো বদ্রি পাখি, ময়ূর সহ বিভিন্ন ধরনের পাখি আর এই পার্কের বিশেষ আকর্ষণ ছিল সম্বর ও চিতল প্রজাতির হরিণ। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এই পার্কটি। প্রতিদিন প্রচুর অংশের পর্যটকরা ভিড় জমাতেন এই পার্কে। কিন্তু ২০১১সালে রাজ্যের সরকার পরিবর্তনের পর ক্রমশ অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে এই সরকারি উদ্যান। অযত্ন আর অবহেলায় ক্রমশ ভেঙে পড়তে থাকে এই পার্কটির পরিকাঠামো। পাখিরা খুঁজে নেয় অন্য কোন বাসা। বন্ধ হয়ে যায় ঝুলন্ত ব্রিজ, মুখ থুবড়ে পড়ে প্যাডেল বোট, অন্যত্র নিয়ে চলে যাওয়া হয় টয় ট্রেন। আর ক্রমশ কমতে শুরু করে পর্যটকের সংখ্যা। এই সময় থেকে আজ পর্যন্ত জঞ্জালে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই পার্ক। ২০১৫ সাল নাগাদ এই পার্ক থেকে ৬টি সম্বর এবং ১৮টি চিতল হরিণ ডাবগ্রাম-ফুলবাড়িতে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় বনদপ্তর। আর এই সময় এলাকাবাসীদের প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় বনদপ্তরের আধিকারিক থেকে কর্মীদের। জনতার ক্ষোভের মুখে পড়ে ৪টি চিতল হরিণ এই পার্কে রেখে যেতে বাধ্য হয় বনদপ্তর। এরপর ক্রমশ বংশবিস্তার শুরু করে এই চিতল হরিণরা। ২০১৭ সালের বন্যায় মারা যায় ৭টি হরিণ। বর্তমানে এই পার্কে রয়েছে প্রায় ১৩টি চিতল প্রজাতির হরিণ।
পর্যটনের বিকাশ ঘটাতেই গোটা রাজ্যের পাশাপাশি কোচবিহার জেলাতে এধরনের পার্ক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল রাজ্যের তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। এর মধ্যে একটি এই খোল্টা ইকোপার্ক। কিন্তু ২০১১সালের পর থেকে সরকারি সদিচ্ছার অভাবে ধুঁকছে এই পার্কটি। এই এলাকার মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে এই কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে সিপিআই(এম) প্রার্থী বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হলে আবার স্বমহিমায় ফিরবে এই খোল্টা ইকো-পার্ক। উপার্জনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে যাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষের জন্য।
Comments :0