সিকিমে তিস্তা ও চিয়াকুং নদীর সংযোগস্থলের কাছে বড়সড় ভূমিধসে ছড়িয়েছে আশঙ্কা। তার প্রভাবে সমতলে তিস্তার জল ঘোলা হয়ে গিয়েছে। তবে বিপর্যয়ের শঙ্কা সত্ত্বেও মাছের খোঁজে ভোর থেকে তিস্তাপাড়ের খাল-বিল ও ছোট শাখা নদীতে জাল নিয়ে নেমে পড়েছেন মৎস্যজীবীরা।
নেপালের সাম্প্রতিক হিমবাহ-ধসজনিত বিধ্বংসী বন্যার ক্ষত এখনও শুকোয়নি। তার মধ্যেই সিকিমে তিস্তা ও চিয়াকুং নদীর সংযোগস্থলের কাছে বড়সড় ভূমিধসে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
গত রবিবার সিকিমে মঙ্গন জেলার নাগা ফরেস্ট এলাকায় নাগা–তোসা রোডের নতুন করে কাটা পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। থেং টানেলের বিপরীতে এই ধসের জেরে সাময়িকভাবে তিস্তা ও চিয়াকুং নদীর জলপ্রবাহ আংশিক বাধাপ্রাপ্ত হয়।
মঙ্গন জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এই মুহূর্তে তিস্তার জলপ্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে। সঙ্কালাং ও ফিদাংয়ে জলস্তরও স্বাভাবিক, যদিও নদীর জল ঘোলা। তবে ধসের পিছনে জল জমে থাকায় পরিস্থিতির উপর নিরন্তর নজর রাখা হচ্ছে। নিচের দিকের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিকে সতর্ক করতে পুলিশ কন্ট্রোল রুমকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনও প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর এখনও নেই।
আশঙ্কা হলো, জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ যদি আটকে যায় পরে তার প্রভাবে নামতে পারে হড়পা বান। কারণ পাথর, বালির বাধায় জমতে পারে বিপুল জল। জলের চাপে বাধা ভাঙলে জল দ্রুত নেমে আসবে নিচে।
সিকিমের ধসকে নিছক ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই—এমন প্রশ্নই ফের সামনে আসছে। কারণ, সিকিমের মতো ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পাহাড়ি এলাকায় একের পর একে পর এক রাস্তা সম্প্রসারণ ও নতুন সড়ক নির্মাণ এবং পাহাড় কেটে পরিকাঠামো তৈরির কাজ চলছে। গবেষণাতেও সিকিমের রাস্তা করিডরের কাট-স্লোপকে ভূমিধসপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি পরিবেশ সমীক্ষাতেও পাহাড় কাটার ফলে ক্ষয়, ভূমিধস এবং প্রাকৃতিক নিকাশি ব্যবস্থায় প্রভাবের আশঙ্কা স্বীকার করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে সেবক–রংপো রেল প্রকল্পও এগিয়ে চলেছে। প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের অধিকাংশই টানেল নির্ভর; পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের কথাও সরকারি নথিতে উঠে এসেছে।
এর মধ্যেই গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ও শিলাখণ্ড ধসে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণায়নের ফলে হিমালয়ের উচ্চভূমিতে বরফ, শিলা ও ঢালের স্থিতিশীলতা ক্রমেই কমছে।
পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা হচ্ছে। তিস্তা নদী ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অযথা নদীর কাছে না যাওয়া এবং সতর্ক থাকার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রবিবার রাত থেকে জলপাইগুড়ির সমতলে তিস্তার জল বাড়তে শুরু করে। সোমবার ভোরের দিকে জল কিছুটা কমলেও নদীর জল এখনও ঘোলা। দক্ষিণ সুকান্তনগরের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ বিশ্বাস জানান, রাত থেকেই তিস্তায় জল বাড়ার খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই খবরেই সকাল হতেই মৎস্যজীবীদের মধ্যে তৎপরতা দেখা যায়।
জাল মেরামত করে ভোরেই তিস্তার ছোট শাখায় নেমে পড়েন পরিতোষ রায়, রবি রায় ও বিমল দাস। তাঁদের কথায়, জল বাড়লে ঘোলা জলে মাছ ওঠার সম্ভাবনাও বাড়ে। তাই এই সময়টা হাতছাড়া করতে চান না তাঁরা। তাঁদের কথায়, “সারা বছর তো একই রকম মাছ পাওয়া যায় না। এখন যদি জালে ভালো মাছ ওঠে, উৎসবের আগে কিছু বাড়তি টাকা হাতে আসবে। সংসারে তার প্রয়োজন রয়েছে।”
Teesta Sikkim Landslide
সিকিমের ধসে জল ঘোলা তিস্তার, চলছে মাইকিং, মাছ ধরাও
বাড়ছে তিস্তার জল, রঙ ঘোলা।
×
Comments :0