BJP

সেই ‘নারায়ণ’ এখন ব্রাত্য, সঙ্গী শুধুই আক্ষেপ

রাজ্য

মধুসূদন মণ্ডলকে কেউ ব্রিগেডে আমন্ত্রণ জানায়নি। শুভেন্দু অধিকারী শনিবার যখন শপথ নিচ্ছেন, ব্রিগেড থেকে অনেক দূরে ‘নারায়ণ’ মধুসূদন মণ্ডল তখন হলদিয়ায় তাঁর ছোট বাড়িতে টিভিতে চোখ রেখে বসেছিলেন।  
‘নন্দীগ্রাম আন্দোলন’ই শুভেন্দু অধিকারীকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসাবে কাজ করেছে, অন্তত গত দু’দিন সংবাদমাধ্যম তেমন ভাষ্যই ছড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূলের অনেক নেতাও এদিন তেমনই বলেছেন। তাঁদেরই একজন বলেছেন, ‘‘নন্দীগ্রাম না হলে কে চিনত ওকে? মোদী চিনতেন? অমিত শাহ চিনতেন? তখন ও তৃণমূলেরই নেতা ছিল।’’ সেই ‘আন্দোলনে’ ছিল মাওবাদীরা। বিজেপিও। তৈরি হয়েছিল ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’। তার কালো পতাকা আজ আর নন্দীগ্রামে কোথাও দেখা যায় না। সেই ‘লড়াইয়ে’ ছেলেকে হারানো ইমদাদুল সেখের মা ফিরোজা বিবি ২০০৯’এ উপনির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে জিতে বিধায়ক হয়েছিলেন। শনিবার সেই ফিরোজা বিবি প্রথমে ফোন ধরলেন। পরে ফোনটি দিয়ে দিলেন স্বামী মণিরুল সেখকে। মণিরুল কি বললেন? তৃণমূলের সমর্থক, একসময়ে সক্রিয় তৃণমূল কর্মী এই বৃদ্ধ বললেন, ‘‘মানুষ বদল চেয়েছিল। হয়েছে। এই নিয়ে কিছু বলার নেই। শুভেন্দুবাবুর সঙ্গে মিলে আমরা আন্দোলন করেছিলাম। তিনি পরে অন্য দলে চলে যান। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের কিছু বলার নেই। তিনি নন্দীগ্রামের বিধায়ক, ভোটার। তাঁকে নন্দীগ্রাম শুভেচ্ছা জানিয়েছে।’’
কিন্তু মধুসূদন মণ্ডল এতটা চাপা নন। ২০০৭’র ১১ মাস নন্দীগ্রামকে সেই অবরোধ-উত্তেজনার ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়া ‘আন্দোলনের’ অন্যতম অনুঘটক ছিলেন মধুসূদন মণ্ডল। নন্দীগ্রাম তাঁকে চেনে ‘নারায়ণ’ নামে। হাতে ছোট ডাবলি নিয়ে নন্দীগ্রামের গ্রামে গ্রামে বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়নের বিরুদ্ধে প্রচার করতেন ‘নারায়ণ’। মাওবাদীদের পক্ষ থেকে তিনিই প্রথম পা রেখেছিলেন নন্দীগ্রামে। দিনটি ছিল ২০০৭’র ১ জানুয়ারি। তারপর একে একে সুদীপ চোঙদার ওরফে কাঞ্চন, রঞ্জিত পাল, তেলুগু দীপকের মতো মাওবাদী নেতারা সদলবলে এসেছিলেন তৃণমূলের হাত শক্ত করতে।
‘‘সেদিন চাঙ্গা ছিলাম।’’ বললেন মধুসূদন মণ্ডল। আজ? ‘‘অবসন্ন, অসুস্থ, সেই মনের জোর আর নেই। ২০২০’র অক্টোবরে জেল থেকে বেরিয়েছিলাম। শুভেন্দুবাবু চাইলে আমাকে ২০১২’তেই বের করতে পারতেন। কিন্তু তিনি করেননি। শুভেন্দুবাবু নিশ্চয়ই ভুলে যাননি যে, ২০০৭’র ১ মে তাঁর সঙ্গে আমি বৈঠক করেছিলাম নন্দীগ্রামে এখন যার বিরাট বাড়ি, সেই সেখ সুফিয়ানের বাড়িতে।’’ ‘নারায়ণ’এর গলায় মৃদু ক্ষোভ, অনেকটা আক্ষেপ। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় যদি নন্দীগ্রামের ভূমিকা থাকে, তাহলে তো আপনাদেরও ভূমিকা আছে? এই প্রশ্নের জবাবে ‘নারায়ণ’ বললেন, ‘‘আমরা (মাওবাদী) শুভেন্দুবাবু সহ তৃণমূলের সভা সফল করার উদ্যোগ নিয়েছি।’’ মধুসূদন এদিন আরও জানান, ‘‘নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢুকেছিল ২০০৭’র নভেম্বরে। তারপরেও তিন বছর ২০১০ পর্যন্ত আমি কিন্তু নন্দীগ্রামে ছিলাম। তারপর বিষ্ণুপুরের আমতলায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম। তখন রাজ্যের এসটিএফ’র প্রধান রাজীব কুমার, যিনি এখন তৃণমূলেরই সাংসদ!’’ 
একসময়ের ‘আন্দোলনের’ সহকর্মী শুভেন্দু অধিকারীর উপর ক্ষোভ থাকলেও ‘নারায়ণ’ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাজ্যের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে। বলেছেন, ‘‘মাওবাদীদের পথ ভুল। জেল থেকে বেরোনোর পর অনেকে আবার ওই পথে যাওয়ার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। আমি সবাইকে ‘না’ বলেছি। ওই পথে হবে না। জীবনে এবারই প্রথম ভোট দিয়েছি। ষাট বছর বয়স হয়েছে। ছেলেটা এক জায়গায় চুক্তিতে কাজ করে। আমি ছেলের পয়সায় খাই। তার মা, বোনও তার উপর নির্ভরশীল। আমি যেচে কখনও শুভেন্দুবাবুর কাছে কিছু চাইনি, যাইনি। আজও যাবো না, চাইবো না। তিনি মনে করলে ডাকবেন।’’
‘নন্দীগ্রাম’এর স্মৃতি সেই ডাবলিটা আজও রেখে দিয়েছেন অবসন্ন, দরিদ্র মধুসূদন মণ্ডল। নাশকতার সব ক’টি অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন। কিন্তু আজকের পশ্চিমবঙ্গের জন্যই কি গিয়েছিলেন নন্দীগ্রামে, পাশে ছিলেন তৃণমূলের? তালপাটি খালের ধারে ‘সিপিএম-মুক্ত’ এলাকা গড়ায় শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ‘লড়াই’ করা একদা-মাওবাদী বললেন, ‘‘ভাবতে পারিনি পশ্চিমবঙ্গটা এমন হবে! এত দুর্নীতি, এত কাণ্ড! এবারের ফলাফলে শাপে বর হয়েছে আমি বলব।’’
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর আসলে শেষ পর্যন্ত প্রথমে একটি মারাত্মক অপশাসন এবং পরে হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতায় আনার কাজে ব্যবহৃত হয়ে যাবে ভেবেছিলেন? ক্লান্ত মধুসূদন মণ্ডল বললেন, ‘‘ভাবিনি এটা হবে। তবু চাই রাজ্যের ভালো হোক। মানুষ কাজ পাক। অভয়ার মতো কাণ্ড যেন আর না হয়।’’

Comments :0

Login to leave a comment