ডাঃ ফুয়াদ হালিম
রাজ্য সরকারেরই দেওয়া তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যখাতে বাস্তবে ক্রমশই কমছে টাকা খরচের পরিমাণ। এমনকি স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সরকারের বরাদ্দ করা টাকাও খরচ করতে ব্যর্থ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় কাজগুলি সম্পন্নই করতে পারছে না রাজ্য সরকার। প্রচুর ঘাটতি থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসায়। চিকিৎসক নিয়োগ থেকে, হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে জমছে প্রচুর অভিযোগ। সরকারি উদাসীনতা ও গাফিলতিতে মানুষ চিকিৎসার জন্য নিজেদের পকেট থেকে খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ওদিকে স্বাস্থ্যবিমার নামে বেসরকারি ক্ষেত্রকে পুষ্ট করা চলছে। সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় চলতি আর্থিক বছরের বাজেট পেশ করেছে রাজ্য সরকার। বাজেট বই বিশ্লেষণ করে যে তথ্য মিলছে তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। বাজেটের তিনটি ক্ষেত্র যেমন, বরাদ্দ- রিভাইজড-অ্যাকচুয়াল অবস্থা বিচার করলেই পরিষ্কার যে চিত্রটি সামনে আসছে তাতে পরিষ্কার রাজ্য স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের প্রকৃত চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক, সাধারণ মানুষ চিকিৎসা থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত।
যেমন ২০২৩-২৪ সালে হেলথ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার খাতে বাজেট ছিল ১৮৪৮৯ কোটি টাকা। সেটি রিভাইজড হয়ে দাঁড়ালো ১৭৯৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেল কাজের পরিমাণ। কিন্তু বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়েছে ১৭২২৬ কোটি টাকার। অর্থাৎ বাজেট বরাদ্দের ঘোষণা যা ছিল তার থেকে প্রায় ১২৬৩ কোটি টাকার কম কাজ হলো বাস্তবে। একইভাবে ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ২০০৫২ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ রিভাইজড হয়ে ২২৪৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাজ্য সরকার মনে করেছিল বরাদ্দের থেকে বেশি টাকা খরচ হবে স্বাস্থ্য পরিকল্পনা রূপায়ণে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে খরচ হলো ১৯০৪২ কোটি টাকা। পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছে যা বরাদ্দ হয়েছিল, ‘অ্যাকচুয়াল’ খরচ হয়েছে তার অনেক কম। এতে ভুগছেন সাধারণ মানুষ।
স্টেট ডেভেলপমেন্ট স্কিমে ২০২৩-২৪ সালে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৭৪৩৬ কোটি টাকা। এই পরিমাণ টাকার অঙ্ক রিভাইজড হয়ে দাঁড়ায় ৭২৯৮ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে প্রকৃত খরচ হয়েছে ৭৩৫৭ কোটি টাকা। কেন্দ্রের টাকা, কিন্তু খরচ করবে রাজ্য সরকার-এই ব্যবস্থাতেও পিছিয়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০২৩-২৪ সালের বরাদ্দে ৩২৭৭ কোটি টাকার কাজ হবে বলেছিল রাজ্য সরকার। রিভাইজড হয়ে তা হয় ২৪৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু খরচ হয়েছে মাত্র ১৮৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ কেন্দ্রের টাকায় যে কাজ রাজ্য সরকারের করার কথা ছিল, সে কাজই করতে পারেনি তারা। একইভাবে ২০২৪-২৫ সালে কেন্দ্রের বরাদ্দ ৩৬১৮ কোটি টাকার কাজ হওয়ার কথা ছিল রাজ্যে। কিন্তু রিভাইজড হয়ে তা দাঁড়ায় ৩৮৯২ কোটি টাকা। বাস্তবে খরচ হয়েছে ২০৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১৬০০ কোটি টাকার কম কাজ হয়েছে রাজ্যে। রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের ব্যর্থতা প্রকাশ পাচ্ছে।
এছাড়াও ২০২৫-২৬ সালে সেন্ট্রাল অ্যাসিস্ট্যান্স স্টেট ডেভেলপমেন্ট স্কিমে বরাদ্দ করা হয়েছিল ৩৫০৬ কোটি টাকা। কিন্তু রিভাইজড করে রাজ্য সরকার বলে দিয়েছে ১৭৭৭ কোটি টাকার কাজ হবে। অর্থাৎ ওই টাকার কাজ করতে পারবে না সরকার তা স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে এই স্কিমে ১৩৬৮ কোটি টাকার বরাদ্দের ঘোষণা হয়েছে। কম বাজেট করে এককথায় হাল ছেড়ে দিয়েছে রাজ্য সরকার, কোনও দিশা বা পরিকল্পনা রাজ্য সরকারের নেই। সম্প্রতি ২০২৬-২৭ আর্থিক বছরে যে বাজেট বরাদ্দ হয়েছে তার পরিমাণ এই স্কিমে ৭৬১৩ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ ২০২৫-২৬-এর বরাদ্দ থেকে কম, ২০২৪-২৫ বরাদ্দ থেকে কম, ২০২৩-২৪ সালের কাছাকাছি। অর্থাৎ তিন বছর আগের বাজেটের প্রায় সমতুল। এর অর্থ স্বাস্থ্যখাতে তিন বছর পিছিয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গ।
স্বাস্থ্যবিমার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের করের টাকার একটা বড় অংশ কর্পোরেট স্বাস্থ্য পরিষেবার হাতে তুলে দিয়ে তাদের মুনাফার গ্যারান্টি দিচ্ছে সরকার। এর ফলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ কমছে। সকলের জন্য স্বাস্থ্য অর্জন করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো প্রাথমিক বা রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সরকার যদি স্বাস্থ্যক্ষেত্রের জন্য কম খরচ করে, যদি স্বাস্থ্য পরিষেবা পেতে গিয়ে মানুষকে নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। তাহলে রোগ প্রতিরোধ বা রোগের মোকাবিলা হবে কোন পথে? ওষুধ কেনা, ডায়গনস্টিক পরীক্ষা, এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের সামগ্রিক চিকিৎসার জন্য ব্যয় অত্যধিক হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য সাথী বহির্বিভাগের চিকিৎসার খরচ বহন করে না। ফলে চিকিৎখাতে মানুষের আর্থিক চাপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিমাগুলোর জন্য এবং প্রচারের জন্য সরকার যা খরচ করে তা আসে সাধারণ মানুষ অর্থাৎ করদাতাদের টাকা থেকে। এই সরকারি খরচের একটা বড় অংশ যায় বেসরকারি বা প্রাইভেট হাসপাতালকে টাকা দেওয়ার জন্য।
আসলে সরকার সাধারণ মানুষের টাকা বেসরকারি বা প্রাইভেট, কর্পোরেট হাসপাতাল বা সংস্থাকে পাইয়ে দেয়। অথচ সরকারি আদেশনামা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে সব চিকিৎসা একেবারে বিনামূল্যে হওয়ার কথা। বেসরকারি সংস্থাগুলি মুনাফার একটি ছাঁকনি তৈরি করছে। এই ছাঁকনি থেকে মুনাফা বাদ দিয়ে যেটুকু বাঁচবে সেইটুকুই মাত্র পরিষেবা হিসাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে। তথ্য বলছে, গোটা দেশের গ্রামীণ এলাকায় মানুষের নিজের পকেট থেকে খরচা ১৮ শতাংশ যা এ রাজ্যের ক্ষেত্রে ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে রাজ্যে শহরের ক্ষেত্রেও মানুষের নিজের থেকে খরচ দেশের তুলমায় ৪ শতাংশ বেশি। এভাবে প্রান্তিক গরিব মানুষের কাছে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা পরিষেবার ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা। বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। নাহলে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ক্রমশই আরও পিছিয়ে পড়বে এ রাজ্য।
মূলত: ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য যে পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল, প্রকৃতপক্ষে সরকার তার বিপরীতে হাঁটছে। বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নয়ন করা যেত। রাজ্য সরকারকে রাজ্য জিডিপি’র ৫% খরচ করতে হবে স্বাস্থ্যের জন্য। আর এই সরকারি খরচের ৪০% প্রাইমারি কেয়ার বা রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার জন্য খরচ করতে হবে। না হলে প্রত্যেক মানুষ স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবে না। মানুষকে দারিদ্র সীমার নিচে ফেলছে চিকিৎসার বিপজ্জনক খরচ। এটা রোধ করতেই হবে। হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী দ্রুত নিয়োগ না করতে পারলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি থেকে যাবে।
রাজ্য সরকারেরই দেওয়া বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে গোটা দেশের নিরিখে এ রাজ্যে মাতৃত্বকালীন হার বা প্রসূতি মৃত্যুর হার বেড়েছে। এছাড়া এ রাজ্যে গত ১০ বছরে বহুলাংশে বেড়েছে শিশু মৃত্যুর হারও। গোটা বিশ্বে সামগ্রিকভাবে এই এমএমআর বা মাতৃ মৃত্যুর হারকে ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে প্রতি ১ লক্ষের মধ্যে ৭০ বা তার নিচে রাখার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা আছে। একইভাবে লক্ষ্য ইনফ্যান্ট মর্টালিটি রেট বা শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১২–তে নামিয়ে আনা। এটাই হলো সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা এসডিজি। কিন্তু বর্তমানে সেই লক্ষ্য থেকে অনেকটাই দূরে পশ্চিমবঙ্গ। সরকারি ওষুধ এবং টিকা প্রস্তুতকারক কারখানাগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে তা মানুষের পক্ষে কল্যাণকর হবে। তবে একইসঙ্গে কঠোর হাতে দমন করতে হবে জাল ওষুধ ও হাসপাতালগুলিতে দালালচক্রের রমরমা কারবার। রাজ্য জুড়ে জাল ওষুধ, ইঞ্জেকশন, জাল স্যালাইনের চক্র যে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, তা আমরা সম্প্রতি দেখেছি।
প্রকৃতপক্ষে সরকার বিভিন্ন নীতি বা প্রকল্প ঘোষণা করে। কিন্তু তা সব নয়, সরকারি প্রকল্পের সার্থকতা নির্ভর করে সরকারি নীতি বা প্রকল্পগুলি সঠিকভাবে কার্যকরী করার ওপর। লক্ষ্য ছিল রাজ্যের ৯০ শতাংশ চিকিৎসা সমস্যা মিটবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি থেকেই। বাকি ১০ শতাংশ চিকিৎসা পরিষেবার ঘাটতি মেটাবে গ্রাম শহরের ছোটো বড় হাসপাতালগুলি। বাস্তবে রাজ্যের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির বেহাল দশা ব্যাপক দুর্দশা ডেকে এনেছে রাজ্যবাসীর জীবনে যা সার্বিকভাবে অত্যন্ত প্রভাব ফেলেছে রাজ্যের গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ওপর। রেফার কেস বেড়ে যাওয়াই তার প্রমাণ।
সরকারের একটি তথ্য বলছে, এ রাজ্যে গ্রামীণ এলাকায় প্রাইমারি হেলথ সেন্টার প্রয়োজন ২১৭৬টি, যেখানে তা বর্তমানে রয়েছে মোটামুটিভাবে ৯১৩টি। কমিউনিটি হেলথ সেন্টার দরকার ৫৪৪টি, রয়েছে ৩৪৮টি। এছাড়া সাবসেন্টার রয়েছে ১০৩৫৭টি, কিন্তু দরকার ১৩২২৫টি। তথ্যগুলি গ্রমাণ করে গ্রামের মানুষের জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তা থেকে বঞ্চিত হন বেশিরভাগ সময়েই। আবার অন্যচিত্রও আছে। গ্রামীণ হাসপাতালে, চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছে রোগীর বাড়ির লোকেদেরই কিনে দিতে হচ্ছে ওষুধ, তুলো, গজ, ব্যান্ডেজ-এই উদাহরণ এ রাজ্যে অজস্র। এমনকি বহুক্ষেত্রে হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জামগুলি থাকে কাগজে কলমেই, বাস্তবে অনেকক্ষেত্রেই তার হদিশ মেলে না।
প্রকৃতপক্ষে রাজ্যে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের হতশ্রী চেহারা বেরিয়ে এসেছে গত কয়েক বছরে। দ্রুত নামছে গরিব মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার সূচক। রক্তাল্পতার চিকিৎসা থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলা, ছানি অপারেশন থেকে ল্যাপারেস্কপিক টিউবেকটমি— সব ক্ষেত্রেই রাজ্য সরকারের ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে। ওদিকে কেন্দ্রের প্রকল্পের টাকা ফেরত চলে যাচ্ছে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারার ফলে।
Comments :0