জয়ন্ত সাহা: কোচবিহার
মুখে স্মিত হাসি, আর সঙ্গী বাইক। ছেলেটা ছুটছে এ গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। গ্রামে ঢুকেই বাইক থামিয়ে সোজা কাকি, মামী, কিংবা জেঠু, কাকু বলে সটান ঢুকে পড়ছে কখনো বাড়ির দাওয়ায়, কখনো বা হেঁসেলে।
আর হাসি মুখে বলছে,আমি প্রণয়। তোমাদের ঘরের ছেলে। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ঢুকে পড়ছে ছেলেটা।
এতদিনে উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের সবাই জেনে গেছে এসএফআইয়ের রাজ্যের সভাপতি তাদের এলাকার ছেলে প্রণয় কার্যী এবারে এই কেন্দ্রের বামফ্রন্টের সিপিআই(এম) প্রার্থী।
ভোরের আলো ফুটতেই প্রণয়ের বাইক ছুটছে কখনো কালজানি ডোডেয়ারহাট, খাগড়াবাড়ি কিংবা পেষ্টারঝাড় আর খাপাইডাঙায়।
কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র লালঝান্ডার বরাবরের শক্ত ঘাঁটি ছিল। ২০১১-তেও এই আসন ছিল বামফ্রন্টের দখলে। পরে বিজেপি জেতে এখান থেকে। এই কেন্দ্র তৃণমুলের অধরাই রয়ে গেছে এ যাবৎ।
এসএফআইয়ের রাজ্যের সভাপতি প্রণয় অবশ্য এখানকার ঘরের ছেলে। তাই সকালে আর রাতে একাই বাইক ছুটিয়ে জনসংযোগ করছেন। আর সারাদিন ঘুরছেন দলের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে। লক্ষ্য লালঝান্ডার জয়কে নিশ্চিত করা।
প্রচারে গিয়ে সহজ সরল ভাষায় সবাইকে ঘরে ঘরে গিয়ে বলছেন, ‘‘লালঝান্ডা ভোটে হেরে গেলেও হারিয়ে যায়নি। বাংলাকে বাঁচাতে হবে। রাজ্যে যখন হওয়ার কথা ছিল কর্মসংস্থান। তখন হচ্ছে ধর্মস্থান।’’ বলছে, ‘‘আমরা চাই ধর্মীয় মেরুকরণ মুক্ত বাংলা। চাই উড়ান উড়ুক বিমান ঘাঁটি থেকে। চাই চকচকা শিল্পতালুক। যোগাযোগের জন্য অনেকগুলো পাকা সেতু চাই। রাজ আমলের জেডি হাসপাতালকে মেডিক্যাল হাব করতে হবে।’’
মানুষের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘরের ছেলে প্রণয়ের সহজ সরল কিন্তু সত্যি কথা গুলো।
কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্র আসলে শহর নয় এ হলো শহরতলি। কোচবিহার শহর থেকে মেরে কেটে চার কিমি দূরে ডোডেয়ারহাট। সব চেয়ে বড় হাট বসে এখানেই। এখানকার স্পেশাল হল মাংস। সেই মাংস কিনতে শহরের খদ্দেরেরাও ভিড় জমায় এখানে। খাগড়াবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার হাট ডোডেয়ারহাট।
এখানকার মানুষের আফশোস, কোচবিহার শহরে কালো পিচের মসৃণ রাস্তা। অথচ ডোডেয়ারহাটে নিকাশি ব্যবস্থা নেই। বর্ষায়এক হাঁটু কাদা জমে। পথ চলা দায়। চারপাশে নোংরা পড়ে। সাফাই করার কেউ নেই। হাটে পরিস্রুত পানীয় জল নেই।
আসলে কোচবিহার উত্তর বিধানসভার পুরো এলাকাটাই এরকম।এই বিধানসভার বর্ধিষ্ণু এলাকা রাজারহাট তো প্রতি বর্ষায় জলবন্দি হয়ে থাকে। রাজারহাট থেকে ডোডেয়ারহাটের সাধারণ মানুষ বলছে, আর বিজেপি নয় এবারে ঘরের ছেলে প্রণয়ের প্রতীকই আমাদের প্রতীক।
বিজেপি ২০১৬ সাল থেকে এই কেন্দ্রে জয়ী হয়েছিল। উন্নয়ন এখানে এত বছরেও আসেনি।
বিজেপির বক্তব্য, তৃণমূল কিছুই করতে দেয়নি। সাধারণ মানুষ যারা গতবার ঢেলে ভোট দিয়েছিল তারাও বলছেন, কেন্দ্রীয় বরাদ্দ দিয়েও তো কোন কাজ হয়নি কেন?
প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামানিক ঘটা করে আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস হাবের শিলান্যাস করেছিলেন।এলাকার আশার বীজ বুনেছিলেন প্রাক্তন ওই মন্ত্রী। বাস্তব বড় নির্মম। সেই মাঠে এখন গবাদি পশু চরে বেড়ায়। ভোট প্রচারে যাওয়া প্রণয়ের কাছে অল্ল বয়সের ছেলেদের দাবি, জিতলে স্পোর্টস হাব করতে হবে।আমরা তোমার সঙ্গে আছি।
এই বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির
গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া হল তৃণমূলের পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষকে গুলি করার অভিযোগে বিধায়ক পুত্র গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এখন তিনি জামিনে মুক্ত। মামলা চলছে আদালতে। সেই ক্ষত লুকোনো যাচ্ছে না কিছুতেই।
অবশ্য তৃণমূলও স্বস্তিতে নেই। যুব নেতা গুলিতে প্রকাশ্যে দিবালোকে খুন হয়েছিলেন ডোডেয়ারহাটে মাংস কিনতে গিয়ে। অভিযোগের তির তৃণমূলের দিকেই। জড়িয়ে আছে বড় নেতার নামও!
এসএফআইয়ের রাজ্য সভাপতি প্রণয় কার্যীর অবশ্য বক্তব্য,"যারা আমার প্রতিপক্ষ তাদের আর তাদের দল সম্পর্কে এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। আমাদের লড়াইটা ওদের আদর্শের বিরুদ্ধে। ওরা কেউ হেভিওয়েট নয়, কারণ কোন ‘হেভি‘ কাজ হয়নি এখানে। আমরা কোন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না। আমরা মানুষের ‘সাজেশন‘ নিচ্ছি।’’
এই বিধানসভা কেন্দ্রের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত চকচকা শিল্পতালুক। যা গড়েছিল বামফ্রন্ট সরকার।সেখানে গত ১৫ বছরে নতুন করে একটা শিল্পও আসে নি। উলটে বেশ কয়েকটি শিল্পের ঝাঁপ বন্ধ হয়েছে এই কয়েক বছরে। আর সে কারনেই বামেদের ৩৪ বছরে কিছুই হয়নি একথা এই বিধানসভা কেন্দ্রে ভুলেও বলেন না তৃনমুল আর বিজেপির নেতারা।
বামেদের আমলে গড়া ক্যান্সার সেন্টার এখন ধুঁকছে। এর মাথায় বসে আছেন মন্ত্রী উদয়ন গুহ। উন্নয়ন যে হয়নি সেটাই যেন জানান দিচ্ছে ক্যান্সার সেন্টার।
আলু এই বিধানসভা কেন্দ্রের অন্যতম কৃষি ফসল। ১৪ বছরে হয়নি সরকারি বা বেসরকারি হিমঘর। ভোটচর্চায় রয়েছে এমন বিষয়।
Comments :0