Md Salim

বামপন্থীদের প্রতি মানুষের ভরসা দেখেই তৃণমূল-বিজেপি পরস্পরের ভয় দেখাচ্ছে: সেলিম

রাজ্য জেলা বাংলা বাঁচানোর ভোট

বরানগরে বক্তব্য রাখছেন মহম্মদ সেলিম। ছবি: অভিজিৎ বসু

লব মুখার্জি: বরানগর 
 জনজীবনের বিষয়গুলি নিয়ে ধারাবাহিক সোচ্চার থাকায় বামপন্থীদের এখন আর কেউই অগ্রাহ্য করতে পারছে না, এমনকি তৃণমূল এবং বিজেপি’ও বাম সমর্থকদের ভোটে থাবা বসানোর চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার বরানগর বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী সায়নদীপ মিত্রের সমর্থনে অনুষ্ঠিতে একটি সভায় একথা বলেছেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, এতদিন বাম শূন্য বলে উল্লাস করেছিল। সিপিআই(এম)’র প্রতি জনগণের আশা ভরসা জাগতে দেখে এখন বিজেপি তৃণমূল নেতারা এতটাই দুশ্চিন্তায় পড়েছে যে কার কতটা লাভ ক্ষতি তার হিসাব কষছে। বাম সমর্থকদের ভোট পেতে এত লালায়িত হয়ে উঠেছে যে বাম পুনরুত্থান ঠেকাতে বিজেপি ভয় দেখাচ্ছে তৃণমূলের, আর তৃণমূল ভয় দেখাচ্ছে বিজেপি’র। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে বামপন্থীদের প্রাসঙ্গিকতা এখন স্পষ্ট হয়ে গেছে, নির্বাচনের কোনও ফলাফল বামেদের বাইরে রেখে হবে না। 
এদিন বরানগর রবীন্দ্র ভবনে অনুষ্ঠিত সভা থেকে মহম্মদ সেলিম দক্ষিণপন্থার উত্থান ও লুটের রাজত্ব থেকে দেশকে বাঁচাতে, বাংলাকে বাঁচাতে বামপন্থীদের জয়ী করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, প্যারিসে নির্বাচনে বামপন্থীরা জিতেছে। যারা বলে বেড়ায় বামপন্থীদের পুনরুত্থান সম্ভব নয় তারা বুঝে নিক, বাংলাতেও বামপন্থার পুনরুত্থান হতে চলেছে। জ্যোতি বসু যেখান থেকে জিতেছিলেন সেই বরানগরেও সিপিআই(এম) প্রার্থীকেই জয়ী করতে হবে।  
বাংলাকে বাঁচানোর জন্য বামপন্থীদের ধারাবাহিক লড়াইয়ের উল্লেখ করে সেলিম বলেছেন, রাজ্যজুড়ে মানুষের দুর্বিষহ অবস্থার কথা আমরা রাজনৈতিক পরিসরে তুলে আনছি। কাজ, রোজগার, শিক্ষা স্বাস্থ্যের অধিকার থেকে গণতান্ত্রিক সমস্ত অধিকার এবং ভোটাধিকার রক্ষায় আমরা মানুষকে একজোট করছি। একেবারে তলা থেকে মানুষের কথা শুনে তাঁদের পরামর্শ ও মতামত নিয়ে সংগ্রাম চালিয়ে মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। এখন বামপন্থীরা বাঁধা গতে এগোচ্ছে না, এরাজ্যের বামপন্থীরা কী করতে পারি, কীভাবে করতে পারি সেটাও বিজেপি তৃণমূল আঁচ করতে পারছে না। বামপন্থীরা ওদের পিছনে ছুটছে না, ওরা বামপন্থীদের ঠেকাতে পিছনে পিছনে ছুটছে। তাই বিজেপি তৃণমূলের অপপ্রচারে, মিডিয়ার ভাষ্যে কোথাও বামপন্থীদের প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করতে পারছে না। বামেদের বিকল্পের কথা জনগণ আর শুনছে না, বামেদেরই বিকল্প বলে জনগণ গ্রহণ করছে। 
এই বাম বিকল্পই রাজ্যের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করে অধিকার আদায় করতে পারে বলে দৃঢ় প্রত্যয়ে সেলিম জানিয়েছেন, আরএসএস-বিজেপি’র পরিকল্পনা অনুসারে তৃণমূলের প্রশাসনিক আধিকারিকদের ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন মানুষের ভোটাধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিতে নেমেছে। বিজেপি আর তৃণমূল চেয়েছিল মানুষের ওপরে এই আক্রমণের সুযোগে ওরা নিজেদের মধ্যে মেরুকরণ টিকিয়ে রাখতে পারবে। কিন্তু বামপন্থীরা সেই মেরুকরণ হতে দিচ্ছে না। জাতি ধর্ম ভাষা নির্বিশেষে সব মানুষের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করছে। এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, এটা বামপন্থীদের মতাদর্শগত সংগ্রামও। 
তিনি বলেন, ত্রিপুরাতে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন সেখানে তৃণমূল নেতারা হইহই করে গিয়েছিলেন, এখন সেখানে বিজেপি সরকার। এখন আর তৃণমূল সেখানে যায় না। যে রাজ্যে আরএসএস মনে করেছিল বিজেপি পা রাখতে পারছে না, সেখানেই তৃণমূলকে ব্যবহার করেছে। বাংলার বুকেও বাম মতাদর্শকে মুছে দিতেই দেশী বিদেশী প্রতিক্রিয়ার শক্তির সাহায্য নিয়ে আরএসএস’র পরিকল্পনায় এরাজ্যে তৃণমূলকে তৈরি করা হয়েছিল। বাম জমানা খতম করতে মমতা ব্যানার্জিকে রসদ জোগানো হয়েছিল। তৃণমূল আসলে আরএসএস’র একটি প্রজেক্ট। এখনও ওদের সেই সেটিং রয়েছে বলেই এরাজ্যে তৃণমূলের সরকার দেড় দশক ধরে টিকে আছে। বিজেপি আর তৃণমূল কেউ কারো বিরুদ্ধে লড়ছে না, নাগপুরের স্ক্রিপ্ট অনুসারে একে অপরকে নেতা ধার দিয়ে লড়াইয়ের অভিনয় করছে। আরএসএস’র সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের চাষ বাংলার বুকে করে দিচ্ছে তৃণমূলই। ওরা রামমন্দির করছে, এরা মহাকাল মন্দির, জগন্নাথ মন্দির, দুর্গা অঙ্গন করে দিচ্ছে। ওরা আরাবল্লীর পাহাড় বেচে দিতে চাইছে, এরা দেউচা পাচামী বেচে দিচ্ছে। স্কুল হাসপাতাল মিড ডে মিল, কর্মসংস্থান জনগণের এসব বিষয় এই দক্ষিণপন্থীদের কর্মসূচিতেই নেই। বাম বিকল্পই সেই কর্মসূচিকে তুলে ধরছে। 
এদিন সভা উপলক্ষে রবীন্দ্র মঞ্চে ব্যাপক ভিড় হয়ে সভাস্থল উপচে গিয়েছিল। মঞ্চের ফ্লেক্সে লেখা ছিল ‘বিজেপি - আরএসএস'র বাংলা দখলের চক্রান্তকে রুখে দিতে, তৃণমূল কংগ্রেসের অপশাসনের বিরুদ্ধে, জ্যোতি বসুর বরানগরকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। সেই আহ্বান জানিয়েই সভায় এছাড়াও ভাষণ দেন সিপিআই(এম)’র উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক পলাশ দাশ, বরানগর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী সায়নদীপ মিত্র, পার্টির জেলা সম্পাদকমণ্ডলী সদস্য ও কামারহাটি কেন্দ্রের প্রার্থী মানস মুখার্জি। সভাপতিত্ব করেন বরানগর বিধানসভা নির্বাচনী কমিটির আহবায়ক শানু রায়। উপস্থিত ছিলেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য সোমনাথ ভট্টাচার্য, কিশোর গাঙ্গুলি, অশোক ভট্টাচার্য, দীপ্ত জিৎ দাস সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। 
পলাশ দাশ সভায় বলেন, তৃণমূল এবং বিজেপি কেউ কারো বিরুদ্ধে লড়ছে না। আসলে বামপন্থার বিরুদ্ধে এই দুই শক্তি বোঝাপড়ার ভিত্তিতে কাজ করে চলেছে। বিজেপি’র হিন্দুত্ব এবং মুসলিম বিরোধী জিগির তৃণমূলকে হটানোর জন্য নয়, রক্ষার জন্য। এসআইআর নিয়ে তৃণমূল এবং বিজেপি জনগণকে হয়রানির শিকার করে, ভোটাধিকার অনিশ্চিত করে দিয়ে, আতঙ্ক সৃষ্টি করে নিজেদের মেরুকরণ বজায় রাখতে চাইছে। নির্বাচন কমিশনের সর্বদলীয় সভাগুলিতেও তৃণমূলের প্রতিনিধিরা ভোটার তালিকা পূর্ণাঙ্গ করার প্রশ্নে কোনও লড়াই করেনি।

Comments :0

Login to leave a comment