প্রতীম দে: দমদম
এক নজরে
স্কুলে স্কুলে কমছে পড়ুয়া, শিক্ষক নেই।
মতিঝিল কলেজে ফিজিক্সে ভর্তি হয়নি কেউ।
বেসরকারি হাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র।
কলোনিতে নিঃশর্ত দলিল, রেলের জমি কিনেও, বাম মেয়াদেই।
খোদ শিক্ষামন্ত্রী যে এলাকার বিধায়ক, সেখানে বন্ধ হয়েছে অসংখ্য প্রাথমিক স্কুল। দমদম। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর বিধানসভা কেন্দ্র। ১৫ বছরের বিধায়ক তিনি সেই এলাকার। তার এলাকাতেই মতিলাল স্কুল, মতিলাল ইনস্টিটিউশন ফল গার্লস, মতিলাল ফ্রি প্রাইমারী স্কুল (মর্ণিং ও ডে), স্বর্ণময়ী বালিকা বিদ্যালয়, মানিকপুর ফ্রি প্রাইমারী স্কুল, প্রাচ্য বাণী মন্দির, বান্ধব নগর প্রাথমিক স্কুলের অবস্থা খারাপ। বন্ধ হওয়ার মুখে শিবতলা হাইস্কুল, ভারতী বিদ্যামন্দির, জহরলাল নেহেরু বিদ্যাপীঠ প্রভৃতি স্কুল। কমেছে পড়ুয়া সংখ্যা। নেই শিক্ষকও। দমদমের তৃণমূলের কর্মীরা এই নিয়ে কোন কথা বলছে না। কণ্যাশ্রী দিয়ে তারা এই সব ঢাকার চেষ্টা করছে।
সুভাষ চক্রবর্তী, বিমান বসুদের কলেজ দমদম মতিঝিল কলেজ। এই শিক্ষাবর্ষে মাত্র ২৬১ জন ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হয়েছে। ফিজিক্স অনার্সে একজনও ভর্তি হয়নি। সরকারি স্কুল আজ দমদমে পরিনত হয়েছে ভ্যাটে। ময়ূখ বিশ্বাসের কথায়, ‘গোটা রাজ্যেই শিক্ষা আজ ব্রাত্য। দমদম তার একটা ছোট চিত্র মাত্র। একটা সময় মতিলাল স্কুল, মতিলাল ইনস্টিটিউশন ফল গার্লস, মতিলাল ফ্রি প্রাইমারী স্কুল গুলোয় পড়ুয়া ভর্তি ছিল। আজ সেই স্কুল গুলো বন্ধ হওয়ার মুখে। মিড ডে মিলের রান্না ঠিক ভাবে হয় না। শিক্ষক নেই। তিন চারজন করে শিক্ষক রয়েছে এক একটা স্কুলে। স্কুল গুলো আজ ময়লা ফেলার জায়গায় পরিনত হয়েছে। পরিষ্কার করা হয় না স্কুল গুলো। রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী তথা এই এলাকার বিধায়কের সময় নেই এই সব দিকে নজর দেওয়ার।’
দমদমের সিপিআই(এম) প্রার্থী ময়ূখ বিশ্বাসের প্রচারে উঠে আসছে দমদমে শিক্ষার বেহাল দশা। সরকারি স্কুলের বেহাল অবস্থার কথা যেমন ময়ূখ বিশ্বাস তুলে ধরছেন, তেমন উঠে আসছে দমদমের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের কথাও।
নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই দমদম বিধানসভা এলাকায় প্রচারে নেমে পড়েছেন ময়ূখ। ছোট বড় মিছিলের পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে করছেন জনসংযোগ। সিপিআই(এম) প্রার্থীর কথায়, ‘মানুষের কাছে যাওয়া, তাদের সাথে কথা বলাকেই আমরা সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। মানুষ কি বলছে তা জানতে হবে শুনতে হবে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষ যেমন মুখ খুলছেন তেমন বিজেপির বিরুদ্ধেও তারা মুখ খুলছেন।’ তিনি বলেন, ‘দমদমের যেই ঐতিহ্য তা শেষ করেছে তৃণমূল। তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন একমাত্র বামপন্থীরা।’
প্রায় ১৭.৫০ বর্গ কি.মি. জুড়ে বিস্তৃত দমদম কেন্দ্রের মোট ওয়ার্ড-৩৯ (দমদম পৌরসভার ২২ টি, দক্ষিণ দমদম পৌরসভার ১৭ টি)। জনসংখ্যা ৫,১৮,১০২ জন, ভোটার ২,২২,৫৫০ জন, বুথ সংখ্যা ২৭৬ টি। জনবিন্যাস হিন্দু ৯৫ শতাংশ, মুসলিম ২.৫০ শতাংশ, তপশিলী জাতি ৮ শতাংশ, তপশিলী উপজাতি ০.৯৫ শতাংশ।
দমদম এলাকায় উদ্বাস্তু মানুষের বসবাস ছাড়াও রয়েছে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। রয়েছে একাধিক কলোনী। এসআইআরের নাম করে এই সব মানুষদের বিপদে ফেলেছে কমিশন। বিজেপি নীরব। দমদমে তৃণমূলও এই নিয়ে সরব নয়।
প্রায় একশো কলোনি এই বিধানসভার মধ্যে রয়েছে এবং এর সিংহভাগ কলোনিতে বামফ্রন্ট আমলে নিঃশর্ত দলিল প্রদান করা হয়েছে। কলোনিগুলোর চেহারাও পাল্টেছে। এই সমস্ত অঞ্চলে গড়ে উঠছে প্রচুর পরিমাণে আবাসন। আবার একাংশের কলোনি আছে যেগুলো রেলের জমি বামফ্রন্ট আমলে ক্রয় করে দলিল দেয়া হয়েছে কলোনি বাসিন্দাদের। কলোনিগুলোর সুসংহত উন্নয়ন আজ বিশেষভাবে জরুরী এবং যে কলনিগুলোতে এখনো দলিল প্রদান করা হয়নি সেগুলো দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে সিপিআই(এম)’এর পক্ষ থেকে।
পাশাপাশি বহু কলোনীতেই প্রাথমিক বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, জলাশয়, গ্রন্থাগার, পূজামন্ডপ, সামাজিক প্রতিষ্ঠনের অফিস প্রভৃতি রয়েছে। এগুলি কলোনীর মানুষের স্বার্থে যথোপযুক্তভাবে কলোনীর সম্পদ হিসাবে রক্ষা করা হবে বলে বলছেন বামপন্থী প্রার্থী।
গত পৌরসভা নির্বাচনে দমদম এবং দক্ষিণ দমদম পৌরসভা ভোট লুঠ করে জয়ী হয় তৃণমূল। দুটি পৌর বোর্ড তৃণমূলের দখলে থাকলেও মানুষকে পৌর পরিষেবা দিতে ব্যার্থ। পানীয় জলের সমস্যা, নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যা রয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে সিন্ডিকেটের দাপট।
দমদমের পূর্ব সিঁথির বাসিন্দা লিডিয়া চাকি। তার কথায়, ‘এলাকায় খাবার জলের সমস্যা রয়েছে। নিকাশির সমস্যা রয়েছে। এখন সব থেকে বড় সমস্যা হচ্ছে শাসক দলের সিন্ডিকেটের দাপট। আপনি রাজি না হলেও আপনাকে বাধ্য করা হবে বাড়ি প্রমোটিংয়ে দেওয়া জন্য।’
তিনি বলতে থাকেন, রাস্তা উঁচু করা হচ্ছে ক্রমশ। যার ফলে পুরনো বাড়ি গুলোয় জল জমলে জল ঢুকছে। বাড়ি সেঁত সেঁতে হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মানুষ বাধ্য হচ্ছে বাড়ি প্রমোটিংয়ে দিতে। সেখানেও শাসক দলের পছন্দ মতো লোকেই দিতে হচ্ছে বাড়ি।’
বিধায়ককে এলাকায় দেখা যায় কিনা সেই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বলেন, ‘মেলা উদ্বোধন ছাড়া বিধায়ককে আর দেখা যায়নি।’
দমদমের স্থানীয় তৃণমূল কর্মীরা মনে করছেন মেলার মাধ্যেই তাদের জনসংযোগ। তাদের কথায়, এলাকায় জল কলের কিছু সমস্যা রয়েছে ঠিক। তা মিটিয়ে নেওয়া যাবে কিন্তু উন্নয়ন হয়েছে। কি কাজ হয়েছে? বিভিন্ন পাড়ার মোড়ে মোড়ে গেট তৈরি হয়েছে। তোড়ন।
তোড়ন হয়েছে কিন্তু রাস্তা কি ভালো হয়েছে? না। সিপিআই(এম) প্রার্থীর কথায়, ‘বেহাল রাস্তাঘাট। প্রায় সারা বছরই রাস্তাঘাটের অবস্থা সঙ্গীন। নির্বাচনের পূর্বে ভোটের জন্য শুরু হয় রাস্তা সংস্কারের কাজ।’ ময়ূখের কথায়, ‘বাগজোলা খালকে কেন্দ্র করে আমরা মাস্টারপ্ল্যান করার কথা বলছি। এর ফলে জমা জলের হাত থেকে মানুষ রেহাই পাবে। নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতি হবে।’
প্রচারে সিপিআই(এম) প্রার্থী বলছেন, রাস্তার উন্নতির কথা। তার সাথে যানজট কামানোর জন্য বিকল্প ভাবনাও তুলে ধরছেন। তার কথায়, ‘দমদমের কয়েকটি সীমিত রাস্তার উপর চাপ কমাতে আরও কিছু পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। যার মধ্যে মাঠকল অঞ্চল থেকে বেদিয়াপাড়া এলাকার মধ্যে দিয়ে বেলগাছিয়া এক্সপ্রেসের সাথে বাগজোলা খালের দুই পাড়ের রাস্তাকে যুক্ত করে ভিআইপি রোড সরাসরি যোগাযোগ মসৃণ করা, ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চল থেকে রেলপথের পাশ দিয়ে একটি চওড়া রাস্তা বাগজলা খালের ধারের রস্তার সাথে যুক্ত করা পরিকল্পনায় ছিলো। এতে দমদম পৌরসভা, বিমানবন্দর ইত্যাদির থেকে নাগেরবাজারের মোড় এড়িয়ে দমদম স্টেশন, কালিন্দি, লেকটাউন ইত্যাদি অঞ্চল ও অন্যান্য দিকে বিকল্প যোগাযোগের সুযোগ হতে পারে। এই সম্ভাবনা আজোও থাকলেও সরকারি উদ্যোগ নেই। এমনই পূর্বসিঁথি রোড একপাশে বাগজলা খাল পাড়ের রাস্তার সাথে যুক্ত করা ও অন্য দিকে শিয়ালদহ মেইন লাইনের নীচ দিয়ে কলকাতা কর্পোরেশন এলাকার সড়কের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাবও বিবেচনাধীন ছিল, যাতে দমদম স্টেশন এলাকার জট এড়িয়ে বিকল্প পথে মানুষ বিটি রোডের দিকে যেতে পারে। দমদম ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে পশ্চিমদিকে বিটি রোডে সরাসরি যাওয়ার জন্য রাস্তা প্রশস্ত করার ভাবনা করা হয়েছিল। নাগেরবাজার এলাকার যানজট এড়িয়ে যাওয়ার জন্য একটি উড়ালপুল নির্মাণ শুরু হয় বিগত বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, যে উড়ালপুল আজ এই অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নাগেরবাজারের মোড়ে বাস টার্মিনাল, দমদম রেল ব্রিজের নীচ দিয়ে ও পাতিপুকুর রেল ব্রীজের নীচ দিয়ে উঁচু গাড়ি ও পথচারীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য আন্ডার পাস নির্মিত হয় বাম আমলেই। এই আন্ডার পাসের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করার সুযোগ পাওয়ার আগেই সরকারের পরিবর্তন হয়। কিন্তু একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধান আজও হয়নি। অল্প বর্ষাতেই আন্ডারপাস জলে ভরে চলাচলের অযোগ্য হয়ে যায়। এর সমাধান করতে হবে।’
দমদম বিধানসভার মধ্যে দুটি পৌর হাসপাতাল রয়েছে। দক্ষিণ দমদম ও দমদম পৌরসভার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি দীর্ঘদিন পৌরসভা নিজেই পরিচালনা করতো। মানুষ কম টাকায় খুব প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা পেতেন। শিশুদের বিভিন্ন সুরক্ষা প্রদানের টিকা সঠিক মানে মানুষ সহজে পেতেন। কিন্তু বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে এগুলির পরিচালনাভার তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দুটি পৌর হাসপাতালের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল। দক্ষিণ দমদম ও দমদম পৌর হাসপাতালে বেড যথাক্রমে মাত্র ৩৫ ও ১৩০টি। কিন্তু এই দুইটি পৌরসভা সমেত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আর সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র নেই। প্রয়োজনে কলকাতার আরজিকর হাসপাতালের উপর নির্ভর করতে হয় প্রান্তিক মানুষদের। এই দুই পৌর স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছাড়া এই অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য অন্তত পক্ষে ১০০-২০০ বেডের হাসপাতাল তৈরির কথাও উঠে আসছে সিপিআই(এম)’এর প্রচারে।
Comments :0