লব মুখার্জি : কামারহাটি
সিপিআই(এম) তথা বামপন্থীদের দুর্বল করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলা হয়েছে। এখন বাংলাকে বাঁচাতে বাম বিকল্পের জন্যই মানুষ সোচ্চার হচ্ছেন। মঙ্গলবার কামারহাটিতে নজরুল মঞ্চে সিপিআই(এম)’র এক সভায় একথা বলেছেন পার্টির রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেছেন, বাম বিকল্পই বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই করতে পারে। বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে এই লড়াইতে সবাইকে শামিল করতে হবে। এ লড়াই লড়তে হবে, এ লড়াই জিততে হবে। ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়ে নয়া বাংলা গড়ে তুলতে হবে।
মঙ্গলবার কামারহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী মানস মুখার্জি এবং বরানগর বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী সায়নদীপ মিত্রের সমর্থনে সিপিআই(এম)’র উত্তর ২৪ পরগনা জেলা কমিটির ডাকে নজরুল মঞ্চে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এবং রাজ্যে তৃণমূল সরকারের হাতে দেড় দশকে রাজ্যের সাধারণ মানুষের সর্বনাশের উল্লেখ করে সভায় মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ২০১১ সাল থেকে আক্রমণ শুধু সিপিআই(এম)’র ওপরে হয়নি, আক্রমণ হয়েছে রাজ্যের সব অংশের মানুষের অধিকারের ওপরে, বিশেষত গরিব প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষজন, মহিলা, আদিবাসী তফসিলি সংখ্যালঘু মানুষদের ওপরে। জীবনজীবিকার ওপরে হামলার প্রতিবাদে মানুষ যাতে শামিল না হয় তার জন্য গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে, এখন ভোটাধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিচ্ছে। বাংলার ঐতিহ্য, মিলনধর্মী সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা সব কিছু আক্রান্ত। স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতার পরে যা কিছু ইতিবাচক গড়ে উঠেছিল সব কিছুর ওপরে আক্রমণ চালিয়ে বাংলার গর্ববোধকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে বাংলা বাঁচাতে না পারলে দেশ বাঁচানো যাবে না। দক্ষিণপন্থার হাত ধরে বাংলার এই বিপদ এসেছে, বাংলাকে বাঁচাতে হলে বামপন্থাই বিকল্প, বামপন্থার পুনরুত্থান ঘটিয়ে বাংলাকে বাঁচাতে হবে।
এর জন্যই বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী মানুষকে একজোট করায় বামপন্থীদের প্রচেষ্টার কথা জানিয়ে সেলিম বলেছেন, এরাজ্যে সিপিআই(এম) শক্তিশালী না হলে বামপন্থীরা শক্তিশালী হবে না। তাই সিপিআই(এম)’কে শক্তিশালী করে সব সংকীর্ণতার ওপরে উঠে আমরা সব বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ করছি। তার সঙ্গে বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী প্রগতিশীল সমাজমুখী সব ব্যক্তি গোষ্ঠীকে একজোট করছি।
তিনি বলেন, ওপর থেকে নিচে ঘৃণা বিদ্বেষ মিথ্যা প্রচার করে, মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে দক্ষিণপন্থার উত্থান হয়। বামপন্থার কথা উঠে আসে নিচ থেকে, ভূমিস্তর থেকে মানুষের সমস্যা ও দাবিগুলি তুলে এনে মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ে তুলে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করছি। নিয়মিত রাজনৈতিক কাজ ছাড়াও বামপন্থীদের বৃত্ত প্রসারিত করার জন্য নানা সমাজমুখী কাজে যুক্তদের আমরা টেনে নিয়েছি। নানা কারণে দূরে চলে যাওয়া মানুষকে আমাদের কাছে টানতে হবে। নানা কারণে যারা ভুল বুঝেছিলেন, যারা অভিমান করেছিলেন সেই সব প্রান্তিক মানুষকে আমরা কাছে টানবো। বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণার সঙ্গেই সঙ্গেই আমরা প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে দিয়েছি, সঙ্গে সঙ্গেই পার্টিকর্মীরা সর্বত্র তাঁদের নিয়ে প্রচারে নেমে পড়েছেন। বাকি প্রার্থীদের নামও কয়েকদিনের মধ্যেই ঘোষণা হয়ে যাবে।
এদিনের সভায় পার্টিকর্মী সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে নজরুল মঞ্চ ছাপিয়ে যায়। বামপন্থীদের দুর্বল করার লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দীর্ঘ চক্রান্তের উল্লেখ করে মহম্মদ সেলিম বলেন, নির্বাচিত বামফ্রন্ট সরকারকে ফেলে দিতেই জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন পুরুলিয়ায় অস্ত্র বর্ষণ করা হয়েছিল। বামপন্থীরা শক্তিশালী থাকতে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তি পা রাখতে পারছিল না, তাই হিন্দুত্ববাদী আরএসএস মমতা ব্যানার্জিকে ‘দুর্গা’ সাজিয়েছিল। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়ার শক্তির মদতে তাঁর হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছিল। মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে তাই তাঁকে অভিনন্দন জানাতে হিলারি ক্লিন্টন চলে এসেছিলেন। এই সব প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে বামপন্থার ওপরে আক্রমণ চালিয়ে রাজ্যের বাম পরিমণ্ডলকে ধ্বংস করার কাজ করেছে মমতা ব্যানার্জি সরকার। এখন সেই পথ দিয়ে আরএসএস মাঠের দখল নিতে চাইছে। তারা ৬০ লক্ষ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে বিবেচনাধীন করে রেখেছে। তৃণমূল বুথে ভোট লুট, গণনায় লুট করে জিতেছে। বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভোটার তালিকাতেই হামলা চালিয়ে মানুষের অধিকার লুট করতে নেমেছে। এই দক্ষিণপন্থীদের হাত থেকে মানুষের ভোটাধিকার, কাজের অধিকার, মজুরির অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, শিক্ষা স্বাস্থ্যের অধিকার রক্ষার জন্য, পরিবেশ রক্ষার জন্য বামপন্থীদের লড়াই। বাংলাকে বাঁচানোর লড়াই।
মহম্মদ সেলিম ছাড়াও সভায় বক্তব্য রাখেন মানস মুখার্জি, সায়নদীপ মিত্র ও প্রদীপ মজুমদার। সভাপতিত্ব করেন ঝন্টু মজুমদার। উপস্থিত ছিলেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য সোমনাথ ভট্টাচার্য, জেলা কমিটি সদস্য কিশোর গাঙ্গুলি, শানু রায়, প্রবীণ নেতা গোবিন্দ গাঙ্গুলি, সুভাষ মুখার্জি এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
ক্যাপশন : মঙ্গলবার কামারহাটি নজরুল মঞ্চে নির্বাচনী সভায় বক্তব্য রাখছেন মহম্মদ সেলিম। ছবি-অভিজিৎ বসু
Left alternative
একমাত্র বাম বিকল্পই পারে এরাজ্য বাঁচাতে : সেলিম
×
Comments :0