কেন্দ্র ও রাজ্য দু’সরকারের শ্রম-বিরোধী নীতি, গ্রামীণ অর্থনীতির অবক্ষয় এবং কর্মসংস্থানের ক্রমহ্রাসের জেরে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। ধান কাটা ও আলু রোপনের মরসুম শেষ হতেই উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় কাজের টান পড়েছে তীব্রভাবে। এই কঠিন বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই মানুষের রুটি-রুজি, অধিকার ও নিরাপত্তার দাবিতে কোচবিহারের তুফানগঞ্জ থেকে শনিবার শুরু হলো সিপিআই(এম)’র ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’।
যাত্রাপথে পরিযায়ী শ্রমিকের ভিড়ের পাশাপাশি আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা নজরে এসেছে, বন্ধ চা-বাগান এলাকার শ্রমিকদের চরম দুর্দশা। একসময় যে বাগানগুলি হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ছিল, আজ সরকারি উদাসীনতায় তা পরিণত হয়েছে অভাবের পীঠস্থানে। এই অঞ্চলের বহু মানুষই এখন চরম হতাশা ও পেটের দায়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন।
বানারহাট, নাগরাকাটা বা মেটলি এলাকার বন্ধ বাগানগুলির শ্রমিকরা কার্যত এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখছেন। স্থায়ী কাজের অভাবে এবং সরকারি সাহায্য না মেলায় বাধ্য হয়ে তাঁদের পরিবার ছেড়ে দূর রাজ্যে যেতে হচ্ছে। একসময়কার বাগান শ্রমিক কৃষ্ণা মুন্ডা, যিনি এখন ঠিকাদারের মাধ্যমে কেরালা যাচ্ছেন, ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, ‘‘বাগানে কাজ থাকলে কেন বাইরে যেতাম? আমরা বাড়ির কাছেই কাজ চাই।’’
যাত্রা শুরুর ঠিক আগের দিন জলপাইগুড়ির ধূপগুড়ি স্টেশন যেন এক অন্য বাস্তবের সাক্ষী। শুক্রবার ও শনিবার দক্ষিণ ভারত-সহ বিভিন্ন রাজ্যে কাজের খোঁজে পাড়ি দেওয়া শ্রমিকদের ভিড়ে স্টেশন প্রায় উপচে পড়েছে। রেলকর্মী থেকে টোটোচালক সকলের বক্তব্য, ‘‘এভাবে ভিনরাজ্যে যাওয়ার চাপ গত কয়েক বছরে বাড়েছে।’’
স্টেশনের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানালেন, কেরালা ও তামিলনাড়ুমুখী যাত্রীর চাপ সবচেয়ে বেশি। তাঁর কথায়, ‘‘পেটের দায় বড়, কাজ না থাকাতে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন শ্রমিকরা।’’ ট্রাভেল এজেন্টরা জানান, বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, পুনে-সহ দক্ষিণ ভারতের শহরগুলিতে শ্রমিক পাঠানোর চাপ এখনও আগের মতোই প্রবল।
শ্রমিকদের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের ঘোষিত ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্পের সুবিধা মাঠে-ময়দানে কার্যত অদৃশ্য। নাগরাকাটা ব্লক’র বাসিন্দা আসিনুল হক বলেন, ‘‘দিল্লি, রাজকোট, পুনে, কেরালা অনেক জায়গায়ই কাজ করেছি। রাজ্য সরকার বছরে ৬০ হাজার টাকা দিবে বলেছে। কিন্তু বাইরে দু’-তিন মাস কাজ করলেই তার চেয়ে বেশি রোজগার হয়।’’
অনেকের অভিযোগ, সমাধান শিবিরে রেজিস্ট্রেশন করিয়েও প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা বা ঋণের সুবিধা মেলেনি। ফলে গ্রামে কাজের অভাবে ফের ‘বাইরেমুখো’ হতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। অক্টোবরে যাঁরা কাজ শেষে ফিরেছিলেন, তাঁরাও নতুন করে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ভিনরাজ্যে শ্রমিক নিগ্রহের কিছু ঘটনার পরে এখন নিরাপত্তার স্বার্থে দল বেঁধে বা পরিচিত ঠিকাদারের মাধ্যমে বাইরে যেতে আগ্রহ বাড়ছে। ঝুঁকি কমাতে শ্রমিকরা এখন পরিচিত ঠিকাদারের হাত ধরছেন।
শ্রমিক সংগঠনের নেতা অজয় মহালীর অভিযোগ, রাষ্ট্রের শ্রম-বান্ধব নীতি প্রায় অনুপস্থিত। সরকারি প্রকল্পে প্রকৃত সুবিধা না পাওয়া, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংকট এবং কেন্দ্র-রাজ্যের উদাসীনতাই বাড়িয়ে তুলছে এই অনাবশ্যক পরিযান।
রবিবার আলিপুরদুয়ার পেরিয়ে সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি ও আভাস রায় চৌধুরীর নেতৃত্বে যাত্রা ৩০ নভেম্বর প্রবেশ করবে জলপাইগুড়ি জেলায়। সিপিআই(এম)’র ‘বাংলা বাঁচাও যাত্রা’য় এক সময়ের বন্ধ চা বাগান শ্রমিক এবং বর্তমানের পরিযায়ী শ্রমিকদের বাঁচানোর দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে। বাংলার মানুষের রুটি-রুজি, অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষাই এই যাত্রার প্রধান সুর।
Bangla Bachao Yatra
পরিযায়ী শ্রমিক, বন্ধ বাগানের সঙ্কট ও রুটি-রুজির লড়াইয়েও বাংলা বাঁচাও যাত্রা
×
Comments :0