বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসবের আর খুব বেশিদিন বাকি নেই। বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দুর্গাপুজো। আর উত্তর ভারতের মতো এ রাজ্যে বিতর্ক তীব্র হলো আমিষ-নিরামিষ খাদ্যবিধি নিয়ে।
এদিকে সোমবারই মিলন মেলায় বিভিন্ন পুজো কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ১ লক্ষ টাকা অনুদানের পাশাপাশি একাধিক ঘোষণাও করেছেন।
সম্ভবত, স্মরণকালের মধ্যে এই প্রথম আমিষ-নিরামিষ বিতর্কের মাঝে হতে চলেছে দুর্গাপুজো। হাওড়ার লিলুয়ায় তিন দিনব্যাপী ‘হনুমন্ত কথা’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পশ্চিমবঙ্গে এসে স্বঘোষিত ধর্মগুরু 'বাগেশ্বর বাবা' নামে পরিচিত ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাঙালি হিন্দুদের সর্বোচ্চ ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে নবরাত্রি পালন ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার আহ্বান জানান। সেইসঙ্গে, পুজোর সময় দুর্গা প্রতিমার আশেপাশে আমিষ খাবার না রাখার ভাষণও দেন তিনি। ওই অনুষ্ঠান থেকেই যাঁরা আমিষ খাবার খান, তাঁদের 'পাষণ্ডী' বলে অভিহিত করেন ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী। পাশাপাশি, এই অভ্যাস ত্যাগ করার কথাও বলেন তিনি। ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী'র এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রশ্ন ওঠে, যাঁকে এই বিতর্কের আগে পর্যন্ত অনেকেই চিনতেন না তিনি বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ঠিক করে দেবেন? সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই এই প্রশ্ন তুলেছেন।
কনটেন্ট ক্রিয়েটর শ্রেয়সী বিশ্বাস বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুকে লিখেছেন, "দয়া করে কোনও বাঙালিকে দুর্গাপুজো কিভাবে উদযাপন করতে হবে, তা শেখাতে আসবেন না।" সঙ্গে দেওয়া ভিডিওটিতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, বাংলার নিজস্ব ধর্মীয় ও খাদ্যাভ্যাস-সংক্রান্ত ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই উৎসবটি নিয়ে একজন 'বহিরাগত' ব্যক্তি নিয়মকানুন বাতলে দিচ্ছেন।
বাংলায় দুর্গোপুজোর রীতিতে নানা বৈশিষ্ট রয়েছে। কোথাও কোথাও ইলিশ বা পাঁঠার মাংস পুজোর অঙ্গ। তা ছাড়াও, বাজার থেকে মাছ বা মাংস খাওয়ার অভ্যাসও বহুদিনের।
যদিও এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে কিছু বলতে শোনা যায়নি। তবে ‘হনুমন্ত কথা’ অনুষ্ঠানে শুভেন্দু অধিকারীকে বাগেশ্বর বাবার সঙ্গে একই মঞ্চ ভাগ করে নিতে দেখা গিয়েছিল। বিতর্কের মুখে পড়ে বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সংবাদমাধ্যমে বলেন, "আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দিন। বাঙালিরা যা খেয়ে এসেছে, তাই-ই খাবে। বাঙালিরা কি মাছ-মাংস খেতে পারবে না? স্বামী বিবেকানন্দ তো এ কথাই বলেছেন। তাঁর চেয়ে বড় কে?"
সমস্যা হলো, উত্তর ভারতের একের পর এক রাজ্যে এই বিজেপি-ই বিভিন্ন উৎসব ঘিরে বারবার খাদ্যবিধি চাপিয়ে দিয়েছে। উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখণ্ডে নবরাত্রি বা শিবভক্তদের কাওয়াঁর যাত্রার সময় আমিষ খাদ্যের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করানো হয়েছে। আবার দিল্লিতে চিত্তরঞ্জন পার্কে মাছের বাজারে খবরদারি করতে দেখা গিয়েছে।
এদিকে বিতর্ক শুরু হয়েছে প্রশাসনের বিজ্ঞাপন নিয়েও। সোমবার দুর্গাপুজোর মিলন মেলার সভা নিয়েই বিজ্ঞাপন দেয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মিলন মেলার আয়োজক হিসেবে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা কর্পোরেশন এবং সহায়ক হিসেবে রাজ্য সরকারের উল্লেখ রয়েছে। ওই বিজ্ঞাপনে 'একাদশভূজা' দুর্গা প্রতিমার ছবি দেখা যায়। বিজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর ছবিও দেখা যায়।
'একাদশভূজা' দুর্গা প্রতিমা নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেন সিপিআই(এম) রাজ্য কমিটির সদস্য শতরূপ ঘোষ। শতরূপ ঘোষ বলেন, "অসুর বধের জন্য দেবতারা দুর্গাকে দশটি হাত ও অস্ত্র দিয়েছিলেন। আর বিজেপি সরকার তাঁকে একটি বাড়তি হাত দিয়েছে।"
যদিও, মিলন মেলার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সরকারি বিজ্ঞাপনে এই ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
ওই অনুষ্ঠান থেকেই মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, সরকারের তরফে ছোট পুজোগুলিকে ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। তার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় আবেদন করতে হবে পুজো কমিটি গুলিকে। তবে, বড়ো পুজো কমিটিগুলিকে এই আর্থিক সাহায্যের আবেদন না করার অনুরোধও জানিয়েছেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, দেবীপক্ষ শুরু হওয়ার আগে পুজো উদ্বোধনের অনুমতি দেওয়া হবে না। ১৩ টি নির্দিষ্ট রাস্তার উল্লেখ করে তিনি বলেন যে ওই রাস্তা গুলি পুজোর সময় ব্লক করা যাবে না। পুজোর দিনে এবং বিসর্জনেও ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ করা সহ অষ্টমীর দিন থেকে এই রাজ্যে সমস্ত মদের দোকান বন্ধ থাকবে বলে জানান তিনি। অষ্টমী থেকে পানশালায় মদ বিক্রি করা যাবে না বলে ঘোষণা করেন তিনি।
the non-vegetarian vs. vegetarian debate Durga Puja
এবার আমিষ-নিরামিষ বিতর্ক বাংলার দুর্গাপুজোতেও, পুজো বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী
×
Comments :0